রবিবার, ১৮ই জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার ৪১ বছর

কেমন ছিল আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন

নিউজ ডেস্ক

🕒 প্রকাশ: ০২:৫২ অপরাহ্ন, ৩০শে ডিসেম্বর ২০২৫

#

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার ভোর ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক।

ভিডিও দেখুনঃ


গৃহবধূ থেকে রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসা খালেদা জিয়া টানা ৪১ বছর সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই সময় থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দলটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ছিলেন।

দলীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন ভূমিকার জন্য তিনি পরিচিতি পান দৃঢ়চেতা নেত্রী হিসেবে। ইতিহাসে নাম লেখান বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।

স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরই মূলত তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর সংকটে পড়ে বিএনপি। সেই কঠিন সময়ে গৃহবধূ খালেদা জিয়া রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে হন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় প্রথমবার বক্তব্য দেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। পরের বছর ১০ মে দলের স্থায়ী চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

বিএনপির প্রচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে সাত-দলীয় জোট গঠিত হয় এবং জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন শুরু হয়। দীর্ঘ আন্দোলনকালজুড়ে তিনি এরশাদ সরকারের সঙ্গে কোনো আপস করেননি। এই সময়ে বারবার তার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং আট বছরে তাকে সাতবার অন্তরীণ করা হয়। তবুও তিনি সক্রিয়ভাবে এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বহু সংকট মোকাবিলা করেছেন খালেদা জিয়া। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর এবং বিশেষ করে ২০০৮ সালের পর আদালতের আদেশে তাকে স্বামীর সময়ে পাওয়া বাড়ি ছাড়তে হয়। একই সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুশোক বহন করতে হয় তাকে। ২০১৫ সালের টানা তিন মাসের অবরোধে তার বিরুদ্ধে আগুন সন্ত্রাসের অভিযোগ ওঠে, যদিও বিএনপি বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

জাতীয়তাবাদী ঘরানার বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নেত্রী এবং নির্বাচনে কখনো নিজের আসনে পরাজিত হননি।

বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ব্যবসায়িক কারণে সেখানে বসবাস করতেন। পরিবারের আদি নিবাস ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজী থানায়। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে পরিবারটি দিনাজপুর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়।

তিনি দিনাজপুর মিশনারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৯৬০ সালে দিনাজপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। একই বছর তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তার দুই সন্তান—তারেক রহমান পিনো ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর জননী তিনি।

এরশাদ আমলের বাইরে ২০০৭ সালেও তাকে কারাবরণ করতে হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে আদালতে নেওয়া হয়। জামিন নামঞ্জুর হলে তাকে সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত সাব জেলে পাঠানো হয়। সেখানে ৩৭২ দিন কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি পান। কারাবন্দি অবস্থাতেই তার মা বেগম তৈয়বা মজুমদারের মৃত্যু হয়।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় তাকে আবারও কারাগারে যেতে হয়। প্রায় দুই বছর কারাভোগের পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনাকালে শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য মুক্তি পান। পরবর্তীতে তার মুক্তির মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে তাকে দণ্ডমুক্ত ঘোষণা করেন।

প্রায় চার দশক ধরে খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি একাধিক আসনে প্রার্থী হয়ে সবগুলোতেই জয়লাভ করেন। সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনটি আসনে জয়ী হন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বয়কট করায় তিনি নির্বাচনের বাইরে ছিলেন। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল।

খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে তার নেতৃত্বে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে এক মাসের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে বিরোধীদলীয় নেত্রী হন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপসহীনতা, নেতৃত্ব ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবেই ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বেগম খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়া বেগম খালেদা জিয়া খালেদা জিয়ার মুক্তি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া খালেদা জিয়া মারা গেছেন