রবিবার, ১৮ই জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হিল্লা বিয়ের আইনি ও সামাজিক বিশ্লেষণ

হিল্লা বিয়ে সম্পর্কে আইন কি বলে?

হামিদুর রহমান বাপ্পা

🕒 প্রকাশ: ১২:২০ অপরাহ্ন, ২৯শে ডিসেম্বর ২০২৫

#

হিল্লা বিয়ে, মুসলিম সমাজে প্রচলিত একটি বিতর্কিত প্রথা, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইনি এবং সামাজিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর আলোচনার দাবি রাখে। তালাকের পর একজন নারী কীভাবে তার প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে আসতে পারেন, সেই জটিল প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে এই প্রথা গড়ে উঠেছে। যদিও ইসলামি শরিয়াতে এর কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে, আধুনিক আইনি কাঠামো এবং মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এর নৈতিকতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই রিপোর্টে হিল্লা বিয়ের আইনি অবস্থান, এর সামাজিক প্রভাব এবং এই বিষয়ে প্রচলিত বিতর্কগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।


হিল্লা বিয়ের ধারণা ও শরিয়াগত ভিত্তি

ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী, একজন পুরুষ যদি তার স্ত্রীকে 'তালাকে বায়েন' বা তিন তালাক প্রদান করে, তবে সেই স্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে তার জন্য হারাম হয়ে যায়। এই তালাক কার্যকর হওয়ার পর, স্ত্রী যদি পুনরায় প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে আসতে চান, তবে তাকে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে অন্য একজন পুরুষকে বিয়ে করতে হয় এবং সেই বিয়ের পর যদি সেই স্বামী তাকে স্বেচ্ছায় তালাক দেন অথবা সেই স্বামী মারা যান, তবেই তিনি ইদ্দত পালনের পর প্রথম স্বামীকে পুনরায় বিয়ে করতে পারেন। এই দ্বিতীয় বিয়েটিই 'হিল্লা বিয়ে' নামে পরিচিত। এই প্রথা 'হিলালা' বা 'তাহলিল' নামেও পরিচিত।

শরিয়াতে এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো তালাকের গুরুত্ব বোঝানো এবং তালাকের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় হিসেবে উপস্থাপন করা, যাতে পুরুষরা তালাকের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে নিরুৎসাহিত হয়।

https://youtube.com/shorts/PjVtf00V6tk?feature=share

বাংলাদেশের আইনে হিল্লা বিয়ের অবস্থান

বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১ সরাসরি হিল্লা বিয়েকে নিষিদ্ধ করেনি। এই আইন মূলত তালাক ও বিয়ের নিবন্ধন, দেনমোহর এবং ভরণপোষণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে। তবে, আইনটি তিন তালাকের প্রক্রিয়াকে কিছুটা পরিবর্তন করেছে। মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১ এর ৭(১) ধারা অনুযায়ী, স্বামী তালাকের নোটিশ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা চেয়ারম্যানকে প্রদান করবে এবং এর একটি কপি স্ত্রীকে দিতে হবে। নোটিশ প্রদানের ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে, যদি না এই সময়ের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পুনর্মিলন ঘটে। এই ৯০ দিনের মধ্যে যদি উভয় পক্ষ আপস না করে, তবে তালাক চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

আইনের চোখে, একটি হিল্লা বিয়ে যদি স্বাধীন ও স্বেচ্ছামূলক হয় এবং সকল আইনি আনুষ্ঠানিকতা (যেমন দেনমোহর, কাবিননামা) সম্পন্ন হয়, তবে এটি একটি বৈধ বিয়ে হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু এই বিয়ের পেছনে যদি কোনো প্রকার জোর-জবরদস্তি, প্রলোভন বা প্রতারণা থাকে, তবে তার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন রায়ে হিল্লা বিয়ের অপব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং নারীর অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থেকেছে। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, হিল্লা বিয়ে যেন নারীর মর্যাদাহানি বা তাকে পণ্যের মতো ব্যবহার করার মাধ্যম না হয়।

হিল্লা বিয়ের সামাজিক প্রভাব ও বিতর্ক

হিল্লা বিয়ে সমাজে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং এটি বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে:

১. নারীর মর্যাদা ও অধিকারের লঙ্ঘন: অনেক ক্ষেত্রে হিল্লা বিয়ে নারীকে একটি "বস্তু" বা "উপকরণ" হিসেবে উপস্থাপন করে, যা তার আত্মমর্যাদা ও অধিকারের পরিপন্থী। নারী এখানে নিজের ইচ্ছার চেয়ে পুরুষদের সিদ্ধান্তের বলি হন।

২. জোর-জবরদস্তি ও অপব্যবহার: বহু ক্ষেত্রে তালাকপ্রাপ্ত নারীকে হিল্লা বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়, এমনকি কখনও কখনও তাকে যৌন নির্যাতনের শিকারও হতে হয়। এটি নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৩. সামাজিক কলঙ্ক: হিল্লা বিয়ের শিকার নারীদের সমাজে প্রায়শই কলঙ্কিত করা হয়, যা তাদের সামাজিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তোলে।

৪. শরিয়ার অপব্যাখ্যা: অনেকেই মনে করেন, হিল্লা বিয়ের বর্তমান প্রচলিত রূপটি শরিয়তের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত এবং এটি একটি অপব্যাখ্যা। শরিয়তের উদ্দেশ্য ছিল তালাকের সিদ্ধান্তকে সুচিন্তিত করা, কিন্তু হিল্লা বিয়ে প্রায়শই নারীকে পুনরায় বিয়ে করার একটি জটিল চক্রে ফেলে দেয়।

৫. যৌন শোষণ: কিছু অসাধু ব্যক্তি হিল্লা বিয়েকে যৌন শোষণের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, যা ধর্মীয় নীতি ও মানবিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

আদালতের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা

বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে হিল্লা বিয়ের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে এবং নারীর অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আদালত বারবার বলেছে যে, কোনো প্রথা যদি মৌলিক অধিকার বা মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে, আদালতের মূল লক্ষ্য হলো নারীর সম্মতি ও স্বাধীন ইচ্ছাকে নিশ্চিত করা।

ভবিষ্যতে, হিল্লা বিয়ের মতো প্রথাগুলোর অপব্যবহার রোধে আরও শক্তিশালী আইনি কাঠামো এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা অপরিহার্য। বিশেষ করে:

  • আইনের সুস্পষ্টতা: হিল্লা বিয়ের প্রেক্ষাপটে নারীর অধিকার রক্ষায় বিদ্যমান আইনে আরও সুস্পষ্ট বিধান যোগ করা প্রয়োজন।

  • সচেতনতা বৃদ্ধি: জনগণকে, বিশেষ করে ধর্মীয় নেতাদের, হিল্লা বিয়ের সঠিক শরিয়াগত ব্যাখ্যা এবং এর অপব্যবহারের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

  • আইনি সহায়তা: হিল্লা বিয়ের শিকার নারীদের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা এবং কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা থাকা উচিত।

  • ধর্মীয় সংস্কার: ধর্মীয় পণ্ডিত ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে হিল্লা বিয়ের আধুনিক ও মানবিক ব্যাখ্যা প্রদানে এগিয়ে আসতে হবে, যা নারীর সম্মান ও অধিকারকে সমুন্নত রাখে।

উপসংহার

হিল্লা বিয়ে বাংলাদেশের সমাজে একটি গভীর সামাজিক ও আইনি সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। যদিও এর একটি শরিয়াগত ভিত্তি রয়েছে, তবে এর অপব্যবহার নারীর মর্যাদা, অধিকার এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বর্তমান আইনি কাঠামো এবং আদালতের রায় নারীর অধিকার রক্ষায় কিছুটা ভূমিকা রাখলেও, এই প্রথার অপব্যবহার রোধে আরও ব্যাপক আইনি সংস্কার, সামাজিক সচেতনতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিবাচক ভূমিকা অপরিহার্য। নারীর সম্মান ও মানবিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রেখে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে হিল্লা বিয়ের মতো বিতর্কিত প্রথাগুলোর যৌক্তিক সমাধান খুঁজে বের করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।

হিল্লা বিয়ে hilla biye