রবিবার, ১৮ই জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট, ১৮৮১

চেকের মামলা কোথায় এবং কীভাবে করবেন?

হামিদুর রহমান বাপ্পা

🕒 প্রকাশ: ০৫:২৯ অপরাহ্ন, ১৮ই ডিসেম্বর ২০২৫

#

বাংলাদেশে চেক ডিজঅনারের মামলা সাধারণত ‘নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট, ১৮৮১’ (Negotiable Instruments Act, 1881) এর ১৩৮ ধারার অধীনে করা হয়। নিচে এই মামলার বিস্তারিত প্রক্রিয়া, সময়সীমা এবং শাস্তির বিধান ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:

১. মামলা করার পূর্বশর্ত ও সময়সীমা (খুবই গুরুত্বপূর্ণ)

চেক ডিজঅনার হলেই সাথে সাথে মামলা করা যায় না। এর জন্য নির্দিষ্ট কিছু আইনি ধাপ ও সময়সীমা মানা বাধ্যতামূলক। এই সময়সীমা পার হয়ে গেলে ১৩৮ ধারায় আর মামলা করা যায় না।

  • ধাপ-১ (চেক জমা দেওয়া): চেকটিতে উল্লেখিত তারিখের ৬ মাসের মধ্যে ব্যাংকে জমা দিতে হবে।

  • ধাপ-২ (ডিজঅনার স্লিপ সংগ্রহ): ব্যাংক যদি জানায় যে অ্যাকাউন্টে টাকা নেই (Insufficient Funds) বা অন্য কোনো কারণে টাকা দেওয়া সম্ভব নয়, তবে ব্যাংক একটি মেমো বা ‘ডিজঅনার স্লিপ’ (Dishonor Slip) দেবে। এটি অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে।

  • ধাপ-৩ (লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ): চেকটি ব্যাংক থেকে ফেরত আসার (ডিজঅনার হওয়ার) তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে চেকের দাতাকে (আসামিকে) একটি আইনি নোটিশ বা লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে।

    • নোটিশটি আইনজীবীর মাধ্যমে রেজিস্টার্ড ডাকযোগে (AD সহ) পাঠানোই উত্তম।

    • নোটিশে টাকা পরিশোধের জন্য চেক দাতাকে ৩০ দিন সময় দিতে হবে।

  • ধাপ-৪ (মামলা দায়ের): নোটিশে উল্লেখিত ৩০ দিন সময় পার হওয়ার পরেও যদি টাকা পরিশোধ না করে, তবে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।

২. কোথায় এবং কীভাবে মামলা করবেন?

  • আদালত: চেকটি যে ব্যাংকের শাখায় উপস্থাপন করা হয়েছিল সেটি যে আদালতের এখতিয়ারভুক্ত অথবা বাদীর বসবাসের বা ব্যবসার স্থানের এখতিয়ারভুক্ত আমলি আদালতে (জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট) মামলাটি করতে হয়।

  • প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
    ১. মূল চেক।
    ২. ব্যাংক থেকে দেওয়া ডিজঅনার স্লিপ।
    ৩. লিগ্যাল নোটিশের কপি।
    ৪. পোস্টাল রিসিট এবং প্রাপ্তি স্বীকারপত্র (AD Card) অথবা ফেরত আসার খাম।
    ৫. জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
    ৬. মামলার আরজি (আইনজীবী প্রস্তুত করবেন)।

৩. মামলার বিচার প্রক্রিয়া

১. প্রাথমিক জবানবন্দি: মামলা দায়েরের সময় ম্যাজিস্ট্রেট বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করবেন এবং মামলাটি আমলে নেবেন।
২. সমন বা ওয়ারেন্ট: আদালত সন্তুষ্ট হলে আসামির প্রতি সমন (Summon) জারি করবেন। আসামি হাজির না হলে পরবর্তীতে ওয়ারেন্ট জারি করা হতে পারে।
৩. জামিন: আসামি আদালতে হাজির হয়ে জামিন চাইতে পারেন। এটি জামিনযোগ্য অপরাধ, তাই সাধারণত জামিন পাওয়া যায়।
৪. চার্জ গঠন ও বিচার: এরপর আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন (Charge Framing) করা হয় এবং সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। বাদী, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেবেন।
৫. রায়: উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায় ঘোষণা করবেন।

৪. শাস্তি (১৩৮ ধারা অনুযায়ী)

অপরাধ প্রমাণিত হলে আদালত আসামিকে নিম্নলিখিত শাস্তি দিতে পারেন:

  • সর্বোচ্চ ১ (এক) বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড; অথবা

  • চেকে উল্লেখিত টাকার তিনগুণ পর্যন্ত জরিমানা; অথবা

  • উভয় দণ্ড (কারাদণ্ড ও জরিমানা)।

(নোট: জরিমানার টাকা থেকে চেকের সমপরিমাণ টাকা বাদীকে দেওয়া হয় এবং বাকিটা সরকারি কোষাগারে জমা হয়।)

৫. আপিল প্রক্রিয়া

মামলায় হেরে গেলে বা সাজা হলে আসামি উচ্চ আদালতে (জজ কোর্টে) আপিল করতে পারেন। তবে আপিল করার শর্ত হলো:

  • আদালত যে জরিমানা বা টাকার রায় দিয়েছেন, তার ৫০% (অর্ধেক) টাকা আদালতে জমা দিয়ে আপিল করতে হবে।

৬. আপস-মীমাংসা

মামলা চলাকালীন যেকোনো পর্যায়ে উভয় পক্ষ চাইলে আদালতের বাইরে বা ভেতরে আপস-মীমাংসা করে নিতে পারেন। টাকা বুঝিয়ে পেলে বাদী মামলা তুলে নিতে পারেন।

কিছু জরুরি পরামর্শ:

  • লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর তারিখ এবং মামলা করার তারিখের সময়সীমা (Limitation) খুব সাবধানে হিসাব করতে হয়। একদিন দেরি হলেও মামলা বাতিল হয়ে যেতে পারে।

  • চেক হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে সাথে সাথে জিডি (GD) করা উচিত এবং ব্যাংকে ‘স্টপ পেমেন্ট’ অর্ডার দেওয়া উচিত।

  • এই মামলা পরিচালনার জন্য একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সতর্কীকরণ: এটি একটি সাধারণ আইনি ধারণা। বাস্তব ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অবশ্যই আইনজীবীর সহায়তা নিন।

চেক চেক