ছবি: সংগৃহীত
হাসান শান্তনু
প্রতিদিন দেশে গড়ে ডিম উৎপাদন হয় সাড়ে ৪ কোটি। সাতদিনে উৎপাদন হয় একদিনের বয়সী ২ কোটি মুরগির বাচ্চা। প্রতি বছরে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ লাখ মেট্রিক টন ফিড উৎপাদন হচ্ছে। ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগে এতো পরিমাণে ডিম, ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা ও ফিড উৎপাদনের কথা চিন্তাও করা যেত না। এসব দিকে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। উৎপাদন বাড়লেও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটা পার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। ফলে সাধারণ আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে থেকে যাচ্ছে পণ্যগুলোর দাম।
হ্যাচারি মালিকদের প্রতিটি মুরগির বাচ্চা উৎপাদন করতে খরচ পড়ে গড়ে ১৫ থেকে ২০ টাকা। তাদের কাছ থেকে খামারিরা এ মুরগির বাচ্চা কিনেন প্রায় ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা দিয়ে। অনেক সময় ১০০ থেকে ১২০ টাকা দিয়েও বাচ্চা পাওয়া যায় না। এ মুরগি কিছুদিন পর বাজারে এলে ক্রেতাদের জন্য দাম বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ঢাকার কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজারের খুচরা ব্রয়লার মুরগীর ব্যবসায়ী আজমল হোসেন বৃহস্পতিবার (৯ই জানুয়ারি) জানান, এদিন খুচরায় প্রতি কেজি মুরগি বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২২০ টাকায়।
দেশে বেশিরভাগ ডিম উৎপাদন করেন সারাদেশের খামারিরা। তবে ডিমের দাম নির্ধারণ করেন ঢাকার কাপ্তানবাজার ও কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন আড়তের ডিম ব্যবসায়ীরা। এসব ব্যবসায়ীর আছে সিন্ডিকেট। তারা ইচ্ছেমাফিক দাম বাড়ান বলে অভিযোগ আছে। ফলে ডিমের উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে এর দাম বেশি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া মনে করেন, ‘প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি ডিম উৎপাদন হলেও তা দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়।’
দামের এতো ফারাকের কারণ
এসব পণ্য বাজারে এসে দামের এতো ফারাক হয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করলে পোলট্রিশিল্প রক্ষা অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মফিজুল ইসলাম মল্লিক বলেন, ‘হ্যাচারি মালিককরা মুরগির বাচ্চা থেকে অতিরিক্ত লাভ করতে চান। তারা অতিরিক্ত লাভ না করে যৗেক্তিক দামে মুরগির বাচ্চা বিক্রি করলে খামারিরা কম দামে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে পারতেন। তখন স্বাভাবিকভাবে খামারিদের লাভবান হওয়ার পাশাপাশি মুরগির খুচরা বাজারে দামও কিছুটা কমতো।’
অন্তত তিনজন খামারির সঙ্গে সুখবর ডটকম কথা বললে তারা অভিযোগ করেন, বাজারে ব্রয়লার মুরগির খাবারের দাম কমে না। ফিডের প্রধান উপাদান ভুট্টা। ভুট্টার দাম বাজারে কমেছে। দেশে পোল্ট্রি খাদ্যের চাহিদা ৭০ থেকে ৮০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৬০ ভাগই লাগে ভুট্টা আর সয়াবিন কেক প্রয়োজন হয় ২০ ভাগ। দাম না কমায় এগুলো কিনতে বিশাল পরিমাণ টাকা গুনতে হয় খামারিদের। ফলে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। তাদের দাবি, সব ধরনের মুরগির বাচ্চার দাম ২০ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে আনা দরকার। এ দাবি পূরণ না হলে চলতি জানুয়ারি মাস থেকে সারাদেশের সব খামারের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে খামারি মালিকদের সংগঠন পোলট্রিশিল্প রক্ষা অ্যাসোসিয়েশন।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, ‘মুরগির খাদ্য ও বাচ্চার সঙ্গে দেশের কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান বেআইনভাবে ডিম ও মুরগি উৎপাদন করছে। এতে বিভিন্ন জেলা-উপজেলার ছোট খামারিরা বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারছেন না। আবার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফিড ও মুরগির বাচ্চার অযৌক্তিক মূল্য বাড়ানো হয়।’
বিপিএ মনে করে, মধ্যস্বত্বভোগী অসাধু চক্র না থাকলে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম কমানো সম্ভব। আগামী পবিত্র রমজান মাসে রাজধানীর ১০০টি স্থানে ন্যায্যমূল্যে ডিম, মুরগি ও কৃষিপণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে বিপিএ। ১২ই জানুয়ারি থেকে ঢাকার ২০টি স্থানে সীমিত পরিসরে বিক্রি শুরু হবে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে ১০০টি স্থানে এ কার্যক্রম বাড়ানো হবে। সংগঠনটি বলেছে, রমজানে ডিম ও মুরগির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা ও ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে তারা এ উদ্যোগ নিয়েছে।
আলাপ করলে একাধিক বিশেষজ্ঞ বলেন, দেশে প্রতিদিন কতো ডিম, মুরগির প্রয়োজন ও কতোগুলো মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হয়, এর যথাযথ কোনো তথ্য নেই। দেশে পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড বা মনিটরিং বডি না থাকায় প্রতিদিন কতগুলো বাচ্চা উৎপাদন করা হচ্ছে আর কতগুলো প্রয়োজন হচ্ছে- এর সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই।
খোঁজ নিলে জানা যায়, ২০৪১ সাল নাগাদ সরকার বছরে মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা ২০৮টি, দুধের দৈনিক প্রাপ্যতা ৩০০ মিলিলিটার আর মাংসের দৈনিক প্রাপ্যতা ১৬০ গ্রামে উন্নীত করতে চায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের এ লক্ষ্য পূরণে বর্তমানের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদন বাড়াতে হবে। পোলট্রি বিজ্ঞান সম্পর্কে আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। আর সেই লক্ষ্যেই আগামী ১৮-১৯শে ফেব্রুয়ারি রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৩তম আন্তর্জাতিক পোলট্রি সেমিনার। আর ২০-২২শে ফেব্রুয়ারি পূর্বাচলে অনুষ্ঠিত হবে ‘১৩তম আন্তর্জাতিক পোলট্রি শো’।
খামারি মালিকরা বলছেন, খাবারের দাম কমানো ও উপজেলা পর্যায়ে খামারি তৈরিতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রথমবারের মতো পোলট্রি মনিটরিং বডি গঠনের পরিকল্পনা করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। ২০২৫ সাল পোলট্রি শিল্পে নতুন বিপ্লবের আশাবাদের বছর হতে যাচ্ছে বলে তারা আশাবাদী। দেশে উৎপাদিত মাংসের ৫০ ভাগ আসে পোলট্রি থেকে। নব্বইয়ের দশকে দেশে পোলট্রিতে বিপ্লব হলেও ২০২৫ সাল থেকে প্রথমবারের মতো পোলট্রি রপ্তানি শুরু করা যাবে বলে জানিয়েছে পোলট্রি প্রফেশনালস বাংলাদেশ (পিপিবি)।