রবিবার, ১৮ই জানুয়ারী ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইসলামী আইনে হত্যাচেষ্টার শাস্তি

ইসলামী আইনে হত্যাচেষ্টার শাস্তি

ধর্ম ডেস্ক

🕒 প্রকাশ: ০৮:৪৪ অপরাহ্ন, ১৭ই ডিসেম্বর ২০২৫

#

ইসলামী আইনে হত্যাচেষ্টার শাস্তি

দিন যতই যাচ্ছে ততই যেন মানুষের জীবন তুচ্ছ বলে গণ্য করা হচ্ছে কারণ ছাড়াই মানুষ মানুষকে হত্যা করছে।নির্মম বাস্তবতা হলো আজ মানুষের জীবন নিরাপদ নয়। তুচ্ছ কারণে মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে, তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে অন্য কেউ।

আল কোরআনে মানবজীবনের গুরুত্ব

পবিত্র কোরআনে মানুষের জীবন সম্পর্কে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করে হত্যার বদলা ছাড়া কিংবা পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল।

(সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)

এই আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন একটি প্রাণের নিরাপত্তা মানেই সমাজের নিরাপত্তা। আর সেই নিরাপত্তায় প্রথম আঘাত আসে কোথায়? হত্যার চেষ্টায়। কেননা হত্যার চেষ্টা মানে জীবনের মর্যাদা অস্বীকার করা।

হত্যাচেষ্টা যে কারণে অপরাধ

আধুনিক আইনি কাঠামোর একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি অনেক সময় অপরাধকে ফলাফলের সঙ্গে বেঁধে ফেলে। ইসলাম এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সংশোধন করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সব কাজের মূল্যায়ন হয় নিয়তের ভিত্তিতে।(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১)

ফিকহবিদরা বলেন, অপরাধ সম্পন্ন হওয়ার জন্য তিনটি উপাদান যথেষ্ট : নিয়ত, উপকরণ ও প্রচেষ্টা। হত্যাচেষ্টায় এই তিনটিই বিদ্যমান। ফলে এটি কোনো অসম্পূর্ণ অপরাধ নয়; বরং একটি সম্পূর্ণ নৈতিক অপরাধ।

নবী (সা.) মানুষের ভেতরের সহিংসতাকেও অপরাধের আওতায় এনেছেন, যখন দুই মুসলমান অস্ত্র হাতে মুখোমুখি হয়, তখন হত্যাকারী ও নিহত উভয়েই জাহান্নামি। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, কারণ সে-ও হত্যা করতে উদগ্রীব ছিল।

(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

প্রথম ধাপেই কঠোরতা

ইসলাম অপরাধ দমনে প্রতিরোধমূলক ন্যায়বিচার অনুসরণ করে, নিম্নোক্ত হাদিসে যার প্রতিফলন দেখা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দিকে অস্ত্র তাক করে, ফেরেশতারা তাকে অভিশাপ দেয়। (সহিহ মুসলিম)

অর্থাৎ হত্যার আগুন নেভাতে হবে স্ফুলিঙ্গে।

ফকিহ আলেমরা হত্যাচেষ্টাকে কয়েক স্তরে ভাগ করেছেন। তা হলো, সরাসরি প্রাণনাশকারী চেষ্টা, পরিকল্পিত হামলা ও ষড়যন্ত্র এবং সম্মিলিত হত্যাচেষ্টা। ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহ.) বলেন, যদি নিয়ত ও উপকরণ পূর্ণ থাকে, তবে অপরাধ অসম্পূর্ণ হলেও শাস্তি বৈধ। (মাজমুউল ফাতাওয়া)

হত্যাচেষ্টার ব্যাপারে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি

শরিয়তের পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্যের একটি হলো, হিফজুন নফস বা প্রাণ সংরক্ষণ। যদি হত্যার চেষ্টাকে হালকাভাবে দেখা হয়, তবে সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, প্রতিশোধ স্বাভাবিক হয়, আইন অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই কারণেই ইসলাম কঠোর।

হত্যা সংঘটিত না হলে কিসাস কার্যকর হয় না, এ বিষয়ে ফকিহদের ঐকমত্য রয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে অপরাধী শাস্তিমুক্ত থাকবে। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় তাজির অর্থাৎ রাষ্ট্র বা আদালত কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি। অপরাধের ভয়াবহতা, সামাজিক প্রভাব এবং পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা বিবেচনায় শাস্তির ধরন নির্ধারিত হয়। সম্ভাব্য শাস্তি দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড। জনসমক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। অস্ত্র বহনের স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বা নির্বাসন।

ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি হত্যার চেষ্টা করে কিন্তু সফল হয় না, তার শাস্তি এমন হওয়া জরুরি যাতে সে নিজে এবং অন্যরা ভবিষ্যতে এই অপরাধে সাহস না পায়। (মাজমুউল ফাতাওয়া)

আঘাত হলে কিসাস কার্যকর

হত্যাচেষ্টা করতে গিয়ে যদি অঙ্গহানি ঘটে, স্থায়ী জখম হয়, চোখ, হাত বা অন্য কোনো অঙ্গ নষ্ট হয়, তবে এমন অপরাধের জন্য কিসাস প্রযোজ্য হবে। কোরআনের ঘোষণা হলো, জখমের বদলে অনুরূপ জখম।

(সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৪৫)

অর্থাৎ হত্যা না হলেও শারীরিক ক্ষতির পূর্ণ বিচার হবে। ওমর (রা.) বলেন, শাস্তিতে শৈথিল্য সমাজকে ধ্বংস করে।

(মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবা)

যারা এমন অপরাধে লিপ্ত হয় পার্থিব শাস্তিই তাদের জন্য শেষ কথা নয়, বরং পরকালেও তাদের কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। তবে আলেমরা বলেন, এমন অপরাধীর জন্য তাওবার দরজা খোলাই থাকে।

 

লেখক : মুফতি ও মুহাদ্দিস, দারুল উলুম ঢাকা, মিরপুর-১৩

ইসলামী আইনে হত্যাচেষ্টার শাস্তি